বৃহস্পতিবার , জানুয়ারি ২০ ২০২২
Home / সম্পাদকীয় / দেশ ও সমাজ গঠনে সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা ।।। তানভীর আহমেদ

দেশ ও সমাজ গঠনে সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা ।।। তানভীর আহমেদ

একটি উন্নত, আধুনিক, গুজব ও কুসংস্কারমুক্ত দেশ গঠনে সাংবাদিকদের লেখনী যেমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে তেমনি দেশের সম্ববনার পাশাপাশি সমাজে অবহেলিত দিকসমূহ এবং দু:স্থ মানুষের পাশে দাড়ানো ও সহায়তার হস্ত প্রশস্থ করাও সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতার অংশ।একইভাবে সাংবাদিকরা দুই জায়গায় দায়বদ্ধ। একটি বিবেক, অন্যটি সমাজ। কলমই হলো সাংবাদিকদের প্রধান অবলম্বন। সাংবাদিকদের অনেক কষ্টের মধ্য দিয়েও সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হয়। মিথ্যা সংবাদ কিছুক্ষণ বা কয়েকদিনের জন্য কারো কারো কাছে বাহবা কুড়াতে পারে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা যারা সত্য জানেন তাদের কাছে চিরদিনের জন্য ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকে। সাংবাদিকদের লেখনী রাস্ট্রকে দিকনির্দেশন দেয়।শুধু উন্নয়ন সম্পৃক্ত হয়ে ভুলত্রুটি লেখাই সাংবাদিকদের কাজ নয়। বরং উন্নয়নের চিত্রও জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। তুলে ধরতে হবে সমাজের অবহেলিত দিকগুলো । কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে লড়ে সীমিত অধিকার, চাপ ও মৌলিক অধিকার হরণকারী ভীতির মধ্যে সংবাদকর্মীদের সবসময় কাজ করতে হয় ।তা স্বত্তেও দেশ ও সমাজের স্বার্থে সাংবাদিকদের অবহেলিত সমাজ ও দু:স্থ মানুষের পাশে দাড়াতে হবে কেননা সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের আয়না। সাংবাদিকতা একটি মহান ও পবিত্র পেশা। আয়নায় যেমন নিজের চেহারা প্রতিবিম্বিত হয়, তেমনি দেশ, জাতি, সমাজ এমনকি সমকালীন বিশ্বের চলমান ঘটনা, জীবনযাত্রা, চিন্তাচেতনা, জাতীয় স্বার্থ ও দিকনির্দেশনা সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয়। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা জাতির জাগ্রত বিবেক এবং পাঠকরাই হচ্ছে সংবাদপত্রের প্রাণশক্তি। সামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সত্য-সুন্দর এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। আর পেশার মানদণ্ডে সাংবাদিকতা একটি মহৎ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সম্মানজনক পেশা।একজন পেশাদার সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা সত্যের কাছে সর্বপ্রথম। তারপর তিনি দায়বদ্ধ তার সমাজের কাছে। সমাজে বসবাসকারী জনসমষ্টির কাছে, সামাজিক মূল্যবোধের কাছে, জনসমূহের অধিকার ও নিজেদের দায়িত্ববোধের প্রতি। সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিয়েই সাংবাদিকরা প্রতি প্রভাতে কাজ শুরু করেন। দিনশেষে কাজ সমাপ্ত করে যখন তারা ঘরে ফেরেন, তখন স্মৃতির ঝুলিতে একটা একটা করে গেঁথে চলেন একরাশ মণিমুক্তা। তার সবগুলো নিখাদ, তথ্যনির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ। সাংবাদিকদের কাছে এটিই সত্য। সংবাদপত্রের সত্যও এটি। সভ্য সমাজে এ সত্যটি স্বীকৃত। শুধু স্বীকৃত তা-ই নয়, এ সত্যকে সংরক্ষণের জন্য সর্বত্র সমাজের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে তার স্বীকৃতিও থাকে।একটি সুস্থ ও উন্নত দেশ গঠনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকরা হলেন সুষম গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের কারিগর, যেমন শিক্ষকরা যুগে যুগে চিহ্নিত হয়েছেন মানুষ গড়ার কারিগররূপে। এই অর্থে সাংবাদিকতা নিছক একটি পেশা নয়, যদিও উন্নত পর্যায়ের পেশাদারিত্বই সাংবাদিকদের কার্যক্রমকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতা হলো এক ধরনের মিশন। এক প্রকার জীবনাদর্শ। ব্যক্তি ও সমষ্টির উন্নত জীবনাচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক ধরনের মহতী উদ্যোগ। যেসব সমাজে এই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, সেসব সমাজের সংবাদপত্র যেমন হতে পেরেছে বিশ্বাসযোগ্য এক গণমাধ্যম, দুর্নীতি ও সুরুচি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, অধিকার সংরক্ষণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম, সাংবাদিকরাও তেমনি হয়ে উঠেছেন সম্মানীয় সেলেব্রিটি (Celebrity) লক্ষজনের গণকণ্ঠ, জাতির বিবেকতুল্য।

সত্যানুসন্ধানে বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকার সাংবাদিকদের অফুরন্ত স্বাধীনতা দিয়েছে উন্নত গণতান্ত্রিক তথ্যমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সঙ্গে নিয়েই ব্যক্তিপর্যায়ে, সামাজিক পর্যায়ে, এমনকি বিশ্বপর্যায়ে গণতন্ত্রের মণিমুক্তার জীবনকে সমৃদ্ধ করতে হবে। এই সত্যকে সঠিকভাবে অনুধাবন করেই সাংবাদিকদের কাজ করতে হবে।

সংবাদপত্রের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আদিযুগে পাথর বা শিলালিপিতেই সংবাদ প্রচার করা হতো। তখন সম্রাট বা শাসকের রাজনৈতিক ঘটনাবলি, যুদ্ধের বিবরণ, প্রজা বা নাগরিকদের প্রতি বার্তা প্রচার করা হতো। হরফ বা মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃৃত হয় মধ্যযুগের ১৪৪০-১৪৫০ সালে; ইউরোপের জার্মানিতে। তখন খবর বলতে যুদ্ধ, আজব ও গুজব ছাপা হতো। ১৭০২ সালে প্রথম এক পাতার ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি কারেন্ট’ প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ড থেকে। তখন খবর বলতে চটকদার অপরাধ, কেচ্ছা, নিলাম আর নিষেধাজ্ঞা ছাপা হতো। ভারতে প্রথম পত্রিকা বের হয় কলকাতা থেকে ২৯ জানুয়ারি ১৭৮০ সালে। পত্রিকার নাম ‘বেঙ্গল গেজেট’। টিকেছিল মাত্র দুই বছর। বাংলায় সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের ১৪ মে। পত্রিকার নাম ‘বাঙ্গাল গেজেট’। প্রকাশক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। এই পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতো সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, জন্ম-মৃত্যু, বিয়ের খবর। সতীদাহ নিয়ে এ সময় আরো দুটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সাপ্তাহিক সমাচার ও মাসিক দিগদর্শণ। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকার নাম ‘জ্যোতি’। বেরিয়েছিল ১৯২১ সালে, চট্টগ্রাম থেকে। দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালের ১৮ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম পত্রিকা বেরোয় চট্টগ্রাম থেকে। নাম ‘পয়গাম’। ঢাকা থেকে বের হতো জিন্দেগি, সপ্তাহে মাত্র দুটি সংখ্যা। মাওলানা আকরাম খাঁর সম্পাদনায় ‘আজাদ’ কলকাতা থেকে বেরিয়েছিল ১৯৩৬ সালে। পত্রিকাটি ঢাকায় আসে ১৯৪৮ সালে। ১৯৪৯ সালে বের হয় ‘দ্য পাকিস্তান অবজারভার’ ও ‘দৈনিক সংবাদ’। পরে দৈনিক পাকিস্তান হয়ে যায় দৈনিক বাংলা। ১৯৬৪ সালে আসে পূর্বদেশ, মর্নিং নিউজ। ১৯৭২ সালে সরকারি মালিকানাধীন সাপ্তাহিক বিচিত্রা।সংবাদপত্র যে প্রকৃত পক্ষে ‘ফোর্থ স্টেট’ এ ধারণাটিও মূলত শতাব্দী পুরনো। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গ্যালারিতে উপস্থিত সংবাদপত্র প্রতিনিধিদের লক্ষ করে রাষ্ট্র্র্র কাঠামোতে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বোঝাতে এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন, তারা এই রাষ্ট্রের ‘ফোর্থ স্টেট’। তাই চলমান জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিহার্য। সংবাদপত্র পৃথিবীকে মানুষের মুঠোর মধ্যে এনেদিয়েছে।স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার উন্নয়নে ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ভূমিকার বিষয়টি আমরা আরও বেশি অনুধাবন করতে পেরেছি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে মানুষের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন সংগ্রামের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।সংবাদপত্র একটি দেশ ও জাতিকে যেমন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আবার জাতির সর্বনাশও করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংবাদ পরিবেশনই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ খবর সমাজে শান্তি আনে, আর খারাপ খবর কখনো সমাজকে বিষিয়ে তোলে, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাই সংবাদপত্রে ও সাংবাদিকদের সতর্ক হয়েই লিখতে হয়। সংবাদপত্রে যে সংবাদ সেখানে বিধৃত হবে, সে সংবাদের নানাবিদ উপাদান পাওয়া যাবে সমসাময়িক সমাজ ও সমাজভূমি থেকে। রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় চরিত্র, যা সেই রাষ্ট্রের সমাজ অর্থনীতি ও জীবন ব্যবস্থার প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে অনিবার্যরূপে, তার অপ্রতিরোধ্য প্রভাব সংবাদপত্রের ওপরও বর্তায়।সংবাদপত্র এমন একটি দলিল যা যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণ করে রাখা যায়। সংবাদপত্রকে গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষার বিকল্পহীন প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কারণেই গণতন্ত্র বিপন্ন হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিপর্যয় ঘটে আবার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হলে গণতন্ত্রও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। সংবাদপত্র মূলত পাঠকের জন্য এবং সে পাঠক অবশ্যই সমাজমনষ্ক পাঠক। সংবাদপত্র যখন সমাজের অবিকৃত নানা ঘটনার একটি নিরপেক্ষ সংবাদচিত্র পাঠকদের উপহার দিতে পারে, তখন সে সংবাদপত্র শুধু পাঠকের খোরাক জোগায় না, একজন সাধারণ পাঠককেও সপ্রতিভ নাগরিক করে তোলে। একজন নাগরিক রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হলে সে যেমন জাতির কল্যাণ সাধন করতে পারে না, তেমনি নিজের কল্যাণ সাধনও তার পক্ষে সার্থকভাবে করা সম্ভব নয়। নাগরিকদের রাজনৈতিক জ্ঞান অর্জনের যত উপায় আছে, তার মধ্যে সংবাদপত্রের স্থান শীর্ষে।

তানভীর আহমেদ                                     নির্বাহী সম্পাদক, বিবিসি টাইমস।

Check Also

বিবিসি টাইমস পরিবারের পক্ষ থেকে ঈদের শুভেচ্ছা ।

তানভীর আহমেদ ; ১৪৪০ হিজরি সনের শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। বুধবার সারা দেশে পবিত্র …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: